রিজভীকে ধন্যবাদ

0
76

মাহবুবুল কারীম সুয়েদ

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমদ ব্যাক্তিগত সাহসিকতার জন্যে দেশপ্রেমিকদের ধন্যবাদ পেতেই পারেন। তিনি ভারতীয় পণ্য বয়কটের প্রতি সংহতি শুধু নয় তার গায়ের চাদর ছুড়েছেন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যমে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে পঙ্গুত্ব বরন করা রিজভী তার দল যখন ক্ষমতায় ছিল স্বৈরাচার এরশাদের পতন পরপর তখন কোন সুবিধা পাননি বা নেননি বলেই জানি। ২০০১ সালে যখন অনেকে পুটি মাছ থেকে রুই কাতলা হয়েছে তখন রিজভী কোন মতে রাজশাহি কৃষি ব্যাংকের দায়িত্বে থেকে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ১/১১-র সময় যখন একে একে মৌমাছিরা দল বিমুখ হচ্ছিল তখন রিজভী দলের দফতরের দায়িত্ব নেন। সেই থেকে আকড়ে আছেন দফতর, সাথে দলের অতি গুরুত্বপুর্ন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদও সামাল দিচ্ছেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে সৃষ্ট এই পদে ইতিপু্র্বে দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল দায়িত্ব পালন করেছেন। রিজভী হচ্ছেন তৃতীয়জন যিনি এ পদে আসীন রয়েছেন। কাজে রিজভীর বক্তৃতা বা কোন পদক্ষেপকে আর দশ বিএনপি নেতার সাথে মিলালে হবেনা। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য্য অথবা বার্তার ভিন্নতা রয়েছে।

প্রায় মাস তিনেক ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি বিভিন্ন দেশে থাকা সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত অনলাইন এ্যক্টিভিস্টরা “ভারতীয় পণ্য বর্জন”র ডাক দিচ্ছেন। অনেকে দেশী পণ্যের তালিকা প্রকাশ করছেন। সেই সাথে ভারতীয় পণ্য যা বাংলাদেশের বাজারে দাপটের সাথে ঠিকে আছে তার তালিকা প্রকাশ করছেন। পণ্য বর্জনের এই আহ্বান যে কিছুটা হলেও প্রতিবেশীদের নাড়াচ্ছে তার আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। কয়দিন আগে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধাদল আয়োজিত প্রকাশ্য জনসভার মঞ্চের ব্যানারে লেখা সবারই নজর কাড়ার কথা। সেখানে মঞ্চে লেখা ছিল “ভারতীয় পণ্য বয়কট করুন”। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ দলটির জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যেই মঞ্চে ছিলেন সেখানে এমন ব্যানার টানিয়ে সভা করা নিশ্চয় দলটির আগামী দিনের রাজনীতির ভিন্ন বার্তার ইংগিত দিচ্ছে।

আওয়ামীলীগ আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই পণ্য বয়কট ইস্যুতে কথা বলেছেন। মুখে স্বীকার না করলেও পণ্য বর্জনের এই ডাক যে বেশ গভীরে নাড়া দিয়েছে তার স্পষ্ট আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর এই ইস্যুতে কথা বলা দেখে এবং বিএনপির মঞ্চে ব্যানার টানিয়ে সভা করার মাধ্যমে। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের ভুমিকায় নিজেরা ভোটাধিকার বঞ্চিত বলে বিশ্বাসী তরুনরা যদি এই বর্জন আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে রুপ দিতে পারে তাহলে ভবিষ্যত আঞ্চলিক রাজনীতিতে বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছি।

একথা যেমন অনস্বীকার্য্য যে আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে সুন্দর সুসম্পর্কের বিকল্প নেই তেমনি ভারত আমাদের কোথাও হস্তক্ষেপ করুক তাও কাম্য নয়। খবরদারি কারোরই পছন্দের বিষয় নয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে থাকে ভারত তাদের নিজেদের স্বার্থে বিনাভোটের সরকার টিকিয়ে রেখে দেশের কিশোর থেকে তরুণ হয়ে এখন পু্র্ন যুবকে পরিনত হওয়া বৃহৎ অংশকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করে রাখতে মূল ভূমিকা রাখছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে চীন ও ভারত। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদীদের সাথে চীনের সুসম্পর্ক ছিল সুবিদিত। যতবার জাতীয়তাবাদীরা সরকারে এসেছে ততবার প্রতেবিশীর চাইতে অধিকতর সুসম্পর্ক ছিল চীনের সাথে। কিন্তু ২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় শেষের দিকে নানা সমীকরন ও নানা দিককার ফাদে পড়ে যাওয়া বিএনপির সাথে গনচীনের ঠান্ডা দুরত্ব শুরু হয়ে যায়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের ফরেইন পলিসির গুড পরিচালনা পদ্বতির কারনে সেই দুরত্ব চলমান। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক চীন তাদের কৌশলগত ও বিনিয়োগ জনিত কারনে বর্তমান সরকারের সাথে বেশ সুসম্পর্ক বজায় রেখেই চলছে বলা যায়।

২০০৮ এর নির্বাচনে বিরোধী দলে যাওয়া বিএনপি তাদের ভারত বিরোধীতার ইমেজকে অনেকটা দুরে ঠেলে দিয়ে ভারতীয় লবির কাছে বলা যায় নতজানু হয়ে দিল্লী কা লাড্ডু খাওয়ার এক অসম প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়েছিল। দলটির নীতি নির্ধারনে ভারতীয় লবির সক্রিয়তার খবর পাওয়া যায়। অনেক শুভাকাংখী আড়ালে আবডালে দলের বেশ কিছু নেতার ‘র’ সম্পৃক্ততার কথা নিজেদের মাঝে আলাপ করে থাকেন। যেই বিএনপি এত বিপুল জনপ্রিয়তার মূল পুঁজি ছিল ভারত বিরোধীতা সেই বিএনপি যখন ভারতমুখীতার রাজনীতি করেছে বিগত প্রায় এক দশক ধরে তখন তাদের জনপ্রিয়তা কতদিন ঠিকে থাকত তা ছিল প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়।

বিএনপি নেতৃত্বের হয়ত বোধোদয় হয়েছে। দেরীতে হলেও তারা বুঝেছেন দাসত্বের পথ তাদের নয়। জনতার সাথে থাকা ক্ষমতার থেকে বেশী তৃপ্তিকর।

কোন স্বাধীন দেশের নির্বাচনে অন্যকোন দেশ এমন নির্লজ্ব হস্তক্ষেপ করেনা যেমনটি ভারত বিগত ২০১৪ সালে করেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় আনতে যে তাদের ভূমিকা ছিল তা দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জী নিজ আত্মজীবনিতে উল্লেখ করেছেন। ২০১৪ সালে তো স্বয়ং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক শীর্ষ কর্তা উড়ে এসে জাতীয় পার্টির প্রধান সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত জেঃ এরশাদের সাথে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠক করে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করেছিলেন। ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের নির্বাচন নামের যে তামাশা হয়ে গিয়েছে সেখানেও একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পিছনে তাদেরই মূল ভূমিকা রয়েছে।

বিএনপির উচিত ভারতকে বিশ্বাস না করে অতীতের মত বাংলাদেশের জনগনের প্রতি ভরসা করা। ফ্যাসিবাদ বেশিদিন স্থায়ীত্ব পাবেনা। সময়ের ব্যাবধানে বিনা ভোটে ক্ষমতায় আসার উলংগ কৌশলের কথা এখন কমবেশি দুনিয়ার সবাই জানে। জনতার বিজয় একদিন হবে এবং হারানো ভোটাধিকার ফিরে পাবে। যেহেতু বিশাল প্রতিবেশীর সাথে কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের জনগন পেরে উঠছেনা এবং বারবার প্রতারিত হচ্ছে কাজে এই পণ্য বয়কটই হয়ে উঠুক অন্তত গনমানুষের অন্তরের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যম। হয়ত ভারতের অর্থনীতির আমরা বারোটা বাজিয়ে ফেলতে পারবনা তবে বাংলাদেশের সাধারন মানুষের ঘৃণা, ক্ষোভ এবং নিন্দা জানানোর এই মাধ্যম হয়ে উঠবে অহিংস আন্দোলনের প্রতীক ও ভারতের জন্যে চপেটাঘাতসম।

বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীর মত সাহস নিয়ে অপরাপর জাতীয়বাদী ঘরানার সব নেতারা যদি এমনভাবে এগিয়ে আসেন তাহলে এই উপলক্ষ্যে জনজাগরন সৃষ্টি হবে বলে মনে করি। পরিশেষে রিজভীকে স্যালুট তার সাহসী ভুমিকার জন্যে।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী কলাম লেখক
ইমেইল: mksuyed@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here